• শিরোনাম

    চাকরির বাজারে ফাঁদ

    মির্জা মেহেদী তমাল | সোমবার, ০২ এপ্রিল ২০১৮ | পড়া হয়েছে 163 বার

    চাকরির বাজারে ফাঁদ

    চাকরির বাজারে ফাঁদ

    এখন আর একসঙ্গে খাবার খেতে বসেন না সাইফুল। ভীষণ লজ্জা পান। একসঙ্গে খেতে বসলে গলা দিয়ে তার খাবার নামতে চায় না। বৃদ্ধ বাবার কষ্টার্জিত আয়ের টাকায় আর কতকাল এভাবে খেয়ে যাবেন সাইফুল। বাবার শরীরেও আর সয় না। এই তো সেদিন বাসায় ফিরেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন বাবা। কাজ থেকে পাঁচ মাইল পায়ে হেঁটে বাসায় ফেরা, আর কত সইবে শরীর? জ্ঞান ফেরার পর বাবাকে সেদিন বলেছিলেন সাইফুল, ‘বাবা তোমার আর কাজে যেতে হবে না।’ ছেলের কথা শুনে বাবা হাসলেন। বলেন, ‘ও কিছু না। মাথা একটু ঘুরে গেছিল। পাশ থেকে মা বলছিলেন, ‘তোর বাবার কিছু করতে হবে না, তবে করবেটা কে? এত বড় সংসারের হবেটা কী?’ মায়ের এমন প্রশ্নে সাইফুলের মুখে কোনো জবাব ছিল না। তিনি মনে মনে বলছিলেন, ‘মা, আমি তো চেষ্টা করছি। চাকরির জন্য অনেক ঘুরছি। কিন্তু হচ্ছে না চাকরি।’ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার মনিয়ান্দ গ্রামের সাইফুল ইসলাম পলিটেকনিক থেকে পাস করে বেকার আছেন দুই বছর ধরে। টেক্সটাইলের ওপর ডিপ্লোমা শেষ করা সাইফুল কাঙ্ক্ষিত কাজ জোটাতে পারেননি। কাজের সন্ধানে রাজধানীতেও গিয়েছিলেন।

    পরিচিত অনেকের কাছে চাকরির জন্য ধরনা দিয়েছেন। কিন্তু কেউ তাকে সহযোগিতা করতে পারেননি, বরং উটকো ঝামেলা মনে করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। বৃদ্ধ বাবার দিকে সাইফুল তাকাতে পারেন না। ছোট বোন স্কুল ফির জন্য মায়ের কাছে যখন কান্নাকাটি করে, সাইফুল তখন বাড়ির কোনাকাঞ্চিতে লুকিয়ে থাকেন। রাতের খাবারের সময় সাইফুল বাসার বাইরে হাঁটাহাঁটি করেন। সবার খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে তিনি বাসায় ঢুকে একা খেয়ে নেন। কারও সামনেই তিনি আর পড়তে চান না। তার মুখ কাউকে দেখাতেই যেন লজ্জা পান সাইফুল। একদিন রেলস্টেশনে পত্রিকা হকারের কাছ থেকে নিয়ে সাপ্তাহিক চাকরির পত্রিকা উল্টেপাল্টে দেখছিলেন সাইফুল।

    প্রায় এমন দেখেন তিনি। দেখা শেষ হলে পত্রিকাটি আবার হকারকে ফেরত দিয়ে আসেন। ভিতরের পাতায় ‘আরএ’ নামে একটি কোম্পানির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সাইফুলের চোখ আটকে যায়। অভিজ্ঞতা ছাড়াই ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা বেতন দেওয়া হবে। কোনো ধরনের জামানত নেওয়া হবে না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিটি দেখেই তার মনটা ভালো হয়ে গেল। তার খুব আনন্দ লাগছে। বিজ্ঞপ্তিতে অফিসের নাম ও ঠিকানা না থাকলেও চোখে পড়ার মতো মোবাইল নম্বর দেওয়া আছে। ওই নম্বরে সরাসরি যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। সাইফুল আগপিছ না ভেবে ওই নম্বরে কল দেন। অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে আসে নারীর কণ্ঠ। নিজেকে মনিশা পরিচয় দিয়ে সাইফুলকে বায়োডাটা (জীবনবৃত্তান্ত) ও ছবি নিয়ে কাকরাইলের একটি অফিসে আসতে বলেন।

    নির্দিষ্ট দিন সিভি ও ছবি নিয়ে ঢাকার ‘আরএ’ অফিসে যেতে সাইফুল প্রস্তুত। বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিদায় নেন। বাবা সাইফুলের হাতে ৫০০ টাকার একটি নোট দেন। সাইফুল ‘আরএ’ অফিসে হাজির হন। মনিশা নামের মেয়েটি রিসিপশনে বসা। মনিশা তাকে ১০০ টাকা দিয়ে একটি ফরম পূরণ করতে বললেন। তখনই তার ইন্টারভিউ হবে বলে জানান মনিশা। অপেক্ষায় থাকেন সাইফুল। কিছুক্ষণ পর সাইফুলের ইন্টারভিউর জন্য ডাক পড়ে। অফিসের অ্যাডমিন অফিসার (প্রশাসনিক কর্মকর্তা) জুবায়ের আহমদ তার ইন্টারভিউ নেন। ইন্টারভিউয়ে এমন কিছু প্রশ্ন করা হয়, যার অধিকাংশ জবাব দিতে পারেননি সাইফুল। সাইফুলকে বাইরে বসতে বলা হয়। তিনি নিশ্চিত তার চাকরি হচ্ছে না। কারণ তিনি ইন্টারভিউয়ে প্রশ্নের বেশির ভাগ জবাব দিতে পারেননি। তার মনটা ভীষণ খারাপ হয়। ভাবেন, এমন সব প্রশ্ন করে বসলেন, যা না পারাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কিছু সময় পর মনিশা এসে তাকে জানান, তিনি ইন্টারভিউয়ে টিকেছেন।

    যেন আকাশ থেকে পড়লেন সাইফুল। ভিতরে ভিতরে ভীষণ আনন্দ হচ্ছে তার। কিন্তু সেভাবে প্রকাশ করতে পারছেন না। মোবাইল ফোনে তার বাবাকে প্রথম জানান তার সুখবর। বাবা শুনে বলেন, ‘আমি জানতাম বাবা। তোর চাকরিটা এবার হবে। যাক, ঠিকমতো সব জেনে আসবি। আমি তোর মাকে এই খবরটা জানিয়ে দিচ্ছি।’ অল্প সময় পর মনিশা সাইফুলকে আবারও অবাক করে দিয়ে বললেন, ‘মি. সাইফুল, চাইলে আগামী মাস থেকে আপনি চাকরিতে যোগ দিতে পারবেন। আপনাকে অভিনন্দন’। এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। ভাবেন সাইফুল। এতটা আশা করেননি তিনি। তার ধারণা ছিল, সবেমাত্র ইন্টারভিউয়ে টিকেছেন। আরও কত কিছু আছে।

    সাইফুলকে আবারও ভিতরের রুমে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে অ্যাডমিন অফিসার জানান, প্রথম ছয় মাস তাকে ১০ হাজার টাকা করে বেতন দেওয়া হবে। ছয় মাস পর তার বেতন বাড়ানো হবে। এর আগে তাকে হোস্টেলে থেকে গার্মেন্টসের কাজ শেখার জন্য প্রশিক্ষণ নিতে হবে। এ জন্য থাকা ও খাওয়া বাবদ তাকে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হবে। এরপরই চূড়ান্ত নিয়োগপত্র দেওয়া হবে। পাঁচ হাজার টাকার কথা শুনে মন ভারি হয়ে ওঠে সাইফুলের। মুহূর্তেই তার চেহারা ফ্যাকাসে দেখায়। ভাবেন, টাকা দেবেন কোথা থেকে।

    টানাটানির সংসারে এতগুলো টাকা বাবার কাছেও নেই তিনি জানেন। তাহলে চাকরিটা কি হবে না? আবারও বাবার কাছে ফোন দেন সাইফুল। টাকার কথা বলেন। টাকার কথা শুনে থতমত খান তার বাবা। নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন, আচ্ছা তুই চিন্তা করিস না বাবা। পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে ১০ হাজার টাকার চাকরি হবে, এটা তো চাট্টিখানি কথা না। আমি দেখছি। টাকা হয়ে যাবে। ফোন রাখেন সাইফুল। স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। আর বাবাকে কষ্ট করতে হবে না। এবার বৃদ্ধ বাবা-মার মুখে হাসি ফুটবে। খুশিতে নেচে উঠবে তার আদরের ছোট্ট বোনটি। যে কিনা, স্কুলের বই-খাতা আর ফির জন্য প্রায়ই কান্নাকাটি করে। সেই অফিস থেকে অ্যাডমিন অফিসার সাইফুলকে বলেন, টাকাটা আজই দিতে হবে। নইলে আরও অনেক যোগ্য চাকরি প্রার্থী রয়েছেন তাদের হাতে।’

    এ কথা শুনে একদিন সময় চান সাইফুল। অফিস থেকে সময় দেওয়া হয় তাকে ২৪ ঘণ্টা। সাইফুল ২৪ ঘণ্টা সময় পেয়ে ছুটে যান গ্রামে। তার বাবা ধারদেনা করে ততক্ষণে টাকা জোগাড় করেছেন। পরদিন সকালেই সেই পাঁচ হাজার টাকা সাইফুল নিয়ে যান আবারও ঢাকায়। দিয়ে আসেন অ্যাডমিন অফিসারের হাতে। সাইফুল আবারও ফিরে যান গ্রামে। সঙ্গে নিয়ে যান চাকরির নিয়োগপত্র। মাস শেষ হতে আরও ১২ দিন আছে। এরপরই চাকরিতে তার যোগদান হবে। আনন্দেই কাটছে সাইফুলের। নতুন একটা প্যান্ট আর শার্ট বানাতে দিয়েছেন। পাঁচ দিন পর অফিস থেকে ফোন আসে। সেই অ্যাডমিন অফিসারের ফোন। তিনি সাইফুলকে বলেন, ‘আপনাকে আরও পাঁচ হাজার টাকা দিতে হবে, তা না হলে আপনার জায়গায় অন্য কাউকে নিয়োগ দেওয়া হবে। কিছুই করার নেই।’ সাইফুলের মাথায় তখন আকাশ ভেঙে পড়ল। আরও পাঁচ হাজার টাকা পাবেন কোথায়? কিন্তু টাকা না হলেও তো চাকরি হবে না। মাইর যাবে আগের টাকাও। এবার টাকা ধার নিলেন চড়া সুদে। বিকাশের মাধ্যমে ওই টাকাও পাঠিয়ে দেন। ওই দিনই সাইফুলকে জানানো হয়, তিনি চাইলে চলতি মাস থেকে চাকরিতে যোগ দিতে পারবেন। অবশেষে চাকরিতে যোগ দিতে সাইফুল ঢাকা যান।

    ৪০, বিজয়নগরের (কাকরাইল) অফিসে ঢুকেই সাইফুল অবাক। পরিস্থিতি দেখে জাবেরের জ্ঞান হারানোর জোগাড়। যেন তার মাথায় বাজ পড়ল। পুলিশ পুরো অফিস তল্লাশি করছে। সাইফুলকে দেখে চাকরির জন্য এসেছেন কিনা, জানতে চাইল পুলিশ। এ ছাড়া যে অ্যাডমিন অফিসার তার ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন, তাকে একটি রুমে আটকে রাখা হয়েছে। এ চিত্র দেখে সাইফুলের বুঝতে বাকি রইল না যে তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তার মতো আরও ২০ ভুক্তভোগীও প্রতারণার শিকার হয়েছেন। যাদের আহাজারিতে সেখানকার বাতাস ভারি হয়ে আসছিল। সাইফুল উচ্চৈঃস্বরে কান্না করতে থাকেন। কী বলবেন বাড়িতে গিয়ে। ১০ হাজার টাকারই বা কী হবে? দরিদ্র পরিবারের সন্তান সাইফুলের জীবনটাই যেন অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। শুধু সাইফুল নন, একই চক্রের প্রতারণার শিকার হয়েছেন ঝিনাইদহের সাইম। পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে লেখাপড়া বেশিদূর করতে পারেননি। বৃদ্ধ বাবার পাশে একটু দাঁড়ানোর জন্য অনেক দিন ধরে ছোটখাটো একটি চাকরি খুঁজছিলেন তিনি। ওই প্রতারক চক্র সাইফুলের মতো সাইমের কাছ থেকেও ১০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। একই দিন তারও চাকরিতে যোগ দেওয়ার কথা ছিল।

    চাকরি দেওয়ার নামে এমন প্রতারণার চিত্র সারা দেশের। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে সাইফুল আর সাইমের মতো হাজারো তরুণ, যুবক প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। কেউ এই ধাক্কা সামলে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারছেন, আবার কেউ পারছেন না।

    জানা গেছে, প্রতারক চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন পত্রিকা, যাত্রীবাহী বাস ও দেয়ালে লোভনীয় অফার দিয়ে বিজ্ঞপ্তি ছাপায়। ওই বিজ্ঞপ্তি দেখে চাকরি প্রত্যাশীরা ফোন করতে বাধ্য হন। প্রতারকরা মোবাইল নম্বরগুলো টার্গেট করে বিভিন্নভাবে প্রলোভন দেখায়। পরে চাকরি দেওয়ার নামে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন সময় চাকরি প্রত্যাশীদের আটক রেখে মুক্তিপণও আদায় করা হয়।

    আর মুক্তিপণ না দিলে অনেক সময় মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। পুলিশ সূত্র জানায়, এসব প্রতারক নিজেরাই নিজেদের মতো অফিস ভাড়া নিয়ে নিজেরাই অফিসার সেজে চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। রাজধানীর মিরপুর, ডেমরা, শ্যামলী, বাড্ডা, মৌচাক, পল্টন ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় এ ধরনের প্রতারণা বেশি হচ্ছে বলে জানা গেছে। পুলিশ ও র্যাব সূত্র জানায়, প্রতারণার কয়েক শ অভিযোগ জমা রয়েছে তাদের কাছে। বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার অভিযোগ। পুলিশ ও র্যাব কর্মকর্তারা বলেন, মানুষ একটু সচেতন হলেই এসব প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে।

    সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    জামাই হিসেবে সাংবাদিকরা কেমন?

    ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | 443 বার

    আপনিও হতে পারেন  সাংবাদিক,লেখক!

    ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | 252 বার

    আর্কাইভ

  • ফেসবুকে nabinagar71.com