• শিরোনাম

    মৃত্যুবার্ষিকী

    জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন জনগণ সব ক্ষমতার উৎস

      লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান | বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০১৯ | পড়া হয়েছে 78 বার

    জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন জনগণ সব ক্ষমতার উৎস

    ফাইল ছবি

    জিয়াউর রহমান এক দেশজোড়া-জগৎজোড়া নাম। এ নাম একজন রাষ্ট্রপতির। এ নাম একজন মহান রাষ্ট্রনায়কের- মহান তিনি জীবনাদর্শে, চিন্তা-চেতনায়, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর দূরদর্শিতায়।

    ১৯৭১-এর ২৫ মার্চের সেই ভয়াল কালরাতে যখন পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পোড়ামাটির নীতি জ্বালাও-পোড়াও, হত্যা করো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশজুড়ে গণহত্যা শুরু করে, তখনই চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অবস্থিত অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের উপঅধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান তার সহযোদ্ধাদের বলেন, তোমাদের সিদ্ধান্ত তোমাদের কাছে; কিন্তু আমি আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। To be or not to be, দোলাচলে আর নয়। I revolt। আমি বিদ্রোহ করলাম।

    সহযোদ্ধারা, রেজিমেন্টের সৈনিকরা সবাই তার কথার প্রতিধ্বনি করে সমস্বরে বলে উঠল, আই নয়, উই। we revolt। আমরা বিদ্রোহ করলাম। ২৭ মার্চ মেজর জিয়া কর্ণফুলী নদী অতিক্রম করে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র দখলে নিয়ে প্রথমে নিজ নামে, পরবর্তী সময়ে তা সংশোধন করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাটি পুনঃউচ্চারণ করেন।

    তিনি দেশবাসীকে সশস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে আহ্বান জানান। ইথারে ভেসে আসা তার কণ্ঠের ঘোষণা পথে-প্রান্তরে, নগরে-বন্দরে বিস্তীর্ণ বাংলাদেশের প্রতি কোনায় কোনায় প্রতিধ্বনিত হয়েছিল। বাংলাদেশের (তখন) সাড়ে সাত কোটি মানুষ শুনেছিল। শুনেছিল বিশ্ববাসীও।

    চট্টগ্রামে অবস্থানরত মেজর জিয়ার রেডিও ঘোষণা ও তার নেতৃত্বে অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া সব সেনাছাউনির বেঙ্গল রেজিমেন্টগুলোয় ও অন্যান্য বাঙালি সৈনিকদের মধ্যে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার সঞ্চার করে, অনুপ্রাণিত করে। তারা অন্ধকারে দিশা পায়। ভ্রান্তি কাটিয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা লাভ করে।

    ঢাকার অদূরবর্তী জয়দেবপুরে অবস্থানরত উপঅধিনায়ক মেজর সফিউল্লাহর নেতৃত্বে দ্বিতীয় ইস্টবেঙ্গল, কুমিল্লা সেনাছাউনিতে অবস্থানরত উপঅধিনায়ক মেজর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে চতুর্থ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

    তেমনি ঝাঁপিয়ে পড়ে যশোর সেনানিবাসে অবস্থানরত প্রথম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট ও সৈয়দপুর সেনানিবাসে অবস্থানরত তৃতীয় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট। এর পরের ইতিহাস রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের কঠিন ইতিহাস।

    রক্তের আখরে লেখা এক অনবদ্য গৌরবগাথা, এক বীর জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতার এক অমর আখ্যান। আর এ অগ্নি আখ্যানের অগ্নি পুরুষ, অগ্নিপথের অগ্রযাত্রী মেজর জিয়াউর রহমান।

    মুক্তিযুদ্ধে আমরা জিয়াকে দেখেছি ক্লান্তিহীন যুদ্ধরত, সেক্টর অধিনায়করূপে। ফোর্স (ব্রিগেড) হিসেবে প্রথম গঠিত জেড ফোর্স কমান্ডার হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা দুর্দমনীয়, দুঃসাহসী ও অতুলনীয়। তার সাহস শৌর্যবীর্য, রণদক্ষতা, অধিনায়কোচিত ব্যক্তিত্ব গোটা যুদ্ধে রণাঙ্গনের প্রতিটি সৈনিককে অনুপ্রাণিত করেছিল, সাহস জুগিয়ের্ছিল, মনোবল অটুট রেখেছিল, যুদ্ধের জয় নিশ্চিত করেছিল।

    ১৫ আগস্ট (১৯৭৫) জাতীয় ইতিহাসের মশিলিপ্ত এক মহাকলঙ্কিত দিন। সেদিন মধ্যরাতে এক হৃদয়বিদারক নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন জাতিসত্তার উন্মেষক স্বাধীনতার মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

    রক্তমাখা হাতে তারই দলের এক শীর্ষ নেতা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে নেন আকস্মিক ও অতর্কিতে। সামরিক শাসন জারি হয়। জারি করেন কোনো সামরিক ব্যক্তিত্ব নয়, সোজাসাপ্টা কথায় ক্ষমতালিপ্সু ষড়যন্ত্রকারী দলীয় রাজনৈতিক চক্র। গভীর এক অনিশ্চয়তা, এক মহাঅস্থিরতা নেমে আসে সারা দেশে। স্বাভাবিকভাবেই সেনাবাহিনীতেও এর অভিঘাতের ঢেউ আছড়ে পড়ে।

    আমরা দেখেছি ১৯৭৫-এর নভেম্বরের শুরুর দিনগুলোয় দেশে এক চরম নৈরাজ্য, নৈরাশ্য, এক সীমাহীন হতাশা। অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাহীনতা গোটা জাতিকে সংকটাপন্ন করে তোলে। একটা ভয়ংকর ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়। দেশ তখন সম্পূর্ণ নেতৃত্বহীন। কোনো সরকার নেই। প্রশাসন নেই। কোনো যোগাযোগ নেই।

    বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি বিশ্ব রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে কোথায় যেন ছিটকে পড়েছে। হারিয়ে গেছে। এরই পটভূমিকায় ৭ নভেম্বরে দেশজুড়ে ঘটে সৈনিক-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত এক অভূতপূর্ব অভ্যুথান। জাতির ভাগ্যাকাশে এ ছিল কঠিন যুগসন্ধিক্ষণ, এক প্রলয়ঙ্করী ঝড়।

    সিপাহি জনতার উত্তাল তরঙ্গমালায় সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়া উঠে আসেন জাতীয় নেতৃত্বের পাদপ্রদীপে নেতৃত্বের অসীম শূন্যতায়। সময়টা ছিল জাতির জন্য সত্যি চরম ঝুঁকিপূর্ণ মহাক্রান্তিলগ্ন। সেনাবাহিনীতে কোনো শৃঙ্খলা নেই। নেই চেইন অব কমান্ড, নেই সেনারীতি-নীতি।

    সৈনিকরা সেনাছাউনি থেকে বেরিয়ে সবাই রাজপথে, লোকালয়ে জনতার সঙ্গে অস্ত্র হাতে। জিয়ার জন্য এটা ছিল এক মারাত্মক চ্যালেঞ্জ। সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনা তখন সহজ কাজ ছিল না।

    খাঁচা থেকে যেন বাঘ লোকালয়ে বেরিয়ে এসেছে, তাকে আবার ব্যারাকের মধ্যে ফিরিয়ে আনা কঠিন। জেনারেল জিয়ার দৃঢ় ব্যক্তিত্ব, অসীম সাহসিকতা, আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা, দেশবাসীর চরম আস্থা তাকে জাতীয় এ চরম সংকট উত্তরণে সাহায্য করে।

    জেনারেল জিয়া উলকার মতো ছুটে চলেছেন প্রতিদিন প্রতি মুহূর্ত, এক সেনানিবাস থেকে আরেক সেনানিবাস, এক ব্রিগেড থেকে আরেক ব্রিগেড, এক ইউনিট থেকে আরেক ইউনিট। বাংলাদেশের প্রতিটি সেনাছাউনি তিনি চষে বেড়িয়েছেন। জনতার ঢল, সৈনিকের ভিড়, এর মধ্যে দিয়ে দৃপ্ত পদভারে সামনে এগিয়ে চলেছেন।

    আমার মনে পড়ে ঢাকা সেনানিবাসে তিনি এ সময়ে এক সৈনিক দরবারে এসেছিলেন। মাঠে অস্ত্র উঁচিয়ে উচ্ছৃঙ্খল সৈনিকের ভিড়। চর্তুদিকে মুহুর্মুহু স্লোগান ‘জিয়া ভাই জিয়া ভাই’। ঢাকা সেনানিবাসের আকাশ-বাতাস মুখরিত। পতাকাবাহী গাড়ি রাস্তায় রেখে তিনি হেঁটে সৈনিকদের ঠিক মাঝখানে চলে আসেন।

    মাইক্রোফোনটা হাতে নিয়ে চিৎকার করে বলতে শুরু করেন, ‘shut-up. I am not Zia Bhai. I am bloody well your Chief. Behave properly. তোমরা সবাই চুপ করো। আমি তোমাদের ভাই নই। আমি তোমাদের সেনাপ্রধান। সাবধানে কথা বল।

    সেনা শৃঙ্খলা ভঙ্গ আমি কখনও সহ্য করব না।’ তিনি সবাইকে ব্যারাকে যাওয়ার আদেশ দেন। অস্ত্র জমা দিতে বলেন এবং চেইন অব কমান্ডে ফিরে আসতে বলেন। অবাক বিস্ময়ে আমি লক্ষ করি মুহূর্তের মধ্যে সব কোলাহল স্তব্ধ, সৈনিকরা লাইন ধরে একে একে শৃঙ্খলার সঙ্গে আপন আপন ইউনিটের দিকে হেঁটে চলছে।

    আমার কাছে সেদিন জিয়াকে মনে হয়েছিল তিনি যেন সেই হ্যামিলনের বংশীবাদক, যার বাঁশির সুরে হ্যামিলন নগরীর সব শিশু-কিশোর যে যেখানে ছিল তার পেছনে পেছনে ছুটে চলেছে।

    জেনারেল জিয়া তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে হীনম্মন্যতায় ভোগা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে তার প্রাইড ফিরিয়ে দেন। তিনি সেনাবাহিনীকে জাতীয় সেনাবাহিনীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেন। পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন।

    সেনাবাহিনীকে সুপ্রশিক্ষিত, পেশাগতভাবে সুদক্ষ, অস্ত্র ও সমর সম্ভারে সুসজ্জিত করার লক্ষ্যে সর্বাত্মক মনোযোগ দেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পেশাদক্ষ ও দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী হিসেবে জনগণের পূর্ণ শ্রদ্ধা ও আস্থা অর্জন করে। জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার মূর্তপ্রতীকে পরিণত হয় আক্ষরিক অর্থেই।

    জিয়া দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন জণগণ এবং জণগণই একমাত্র সব ক্ষমতার উৎস। তিনি রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে প্রথম যে কাজটি করেন তা হল সামরিক সরকারের পূর্ণ বেসামরিকীকরণ। তিনি সব রাজনৈতিক দলকে গণতন্ত্র চর্চার পূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করে দেন।

    আওয়ামী লীগ তখন একটা কঠিন সময় অতিক্রম করছিল। দলের অনেক শীর্ষ নেতা মোশতাক সরকারে যোগদান করেছিল। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছিলেন। জিয়া তাকে নিজ দেশে সম্মানে ফিরে আসার সাদর আহ্বান জানান। তাকে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে পূর্ণ সহযোগিতার নিশ্চয়তা প্রদান করেন।

    বাংলাদেশের তদানীন্তন রাজনীতির বাস্তবতা জেনারেল জিয়াকে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে বাধ্য করে। তার ছিল গণতন্ত্রের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস। সত্যিকারের গণতন্ত্রের চেতনায় তাড়িত হয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন।

    রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার প্রথম সুযোগেই তিনি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী বাতিল করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন ঘটান। সংবাদপত্রসহ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনেন। অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে তিনি কৃষিবিপ্লব ও শিল্পের বিকাশ ঘটান। জাতিকে একটি মর্যাদাশীল সম্মানজনক অবস্থানে দাঁড় করান।

    জিয়া সেনাবাহিনী থেকে মেয়াদ পূরণের অনেক আগেই নজিরবিহীনভাবে স্বেচ্ছায় পূর্ণ অবসর গ্রহণ করেন। গণতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার লক্ষ্যে তিনি নিজে দল গঠন করেন।

    তিনি বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে পথে-প্রান্তরে বিরামহীনভাবে ঘুরে বেড়ান। জণগণের সঙ্গে তাদেরই পরিবারের একজন হয়ে যান। তিনি শতশত মাইল হেঁটে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছুটে বেড়ান। মানুষের সুখ-দুঃখের কথা শোনেন। সাহস জোগান।

    মানুষ তাকে আপন করে নেয়। গৃহবধূরা তাকে বাড়ির ভেতরে উঠানে নিয়ে বসায়। রান্নাঘরে মাটির সানকিতে ঘরে যা আছে খেতে দেয়। বৃদ্ধারা শুধু মাথায় হাত রেখে দোয়া করে। আবালবৃদ্ধবনিতা হ্যামিলনের সেই বংশীবাদকের মতো তার পেছনে স্রোতধারার মতো ছুটে চলে।

    বিশ্বে তিনি খ্যাত হন চারণ রাষ্ট্রপতি নামে। একজন সমর নায়কের এমন আমূল পরিবর্তন, রণ থেকে জনে এমন বিশাল বিবর্তন সত্যি বিরল। সমর নায়ক জিয়া নিজেকে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তিলে তিলে নির্মাণ করতে পেরেছিলেন নিখাদ, নিষ্কলুষ এক জনগণমন অধিনায়ক জিয়া করে।

    জিয়াকে তার শাহাদাতবার্ষিকীতে আমার হৃদয় উজাড় করা বিনম্র শ্রদ্ধা।

    লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান : সাবেক সেনাপ্রধান

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    একজন মন্ত্রীর পুরনো দুই টিনের ঘর

    ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭ | 2490 বার

    উখিয়ায় রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ বিতরন

    ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | 921 বার

    তিন বোনের এক স্বামী

    ০৫ জানুয়ারি ২০১৯ | 755 বার

    আর্কাইভ

  • ফেসবুকে nabinagar71.com