• শিরোনাম

    গুরুদক্ষিণা: এদিক ওইদিক

    নিউজ ডেস্ক | সোমবার, ০৯ মে ২০২২ | পড়া হয়েছে 73 বার

    গুরুদক্ষিণা: এদিক ওইদিক

    ফাইল ছবি

    গুরু শিষ্য শব্দ যুগল নিয়ে হাজারো প্রবাদ, প্রবচন ও নীতি কথা সমাজে প্রচলিত রয়েছে। সময়ের পরিক্রমায় অনেক সম্পর্কের উত্থান পতন ঘটলেও গুরু শিষ্য তথা ছাত্র শিক্ষকের মতো দৃঢ় শ্রদ্ধা‌ ভক্তির সম্পর্ক পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। কেননা একজন মানুষ স্বভাবত কারো কাছে পরাজিত হতে চায় না।কিন্তু ওই মানুষটিই সবচেয়ে বেশি খুশি হয় তখন, যখন দেখে তাঁর কোনো শিষ্য বা ছাত্র তাঁকে ছাড়িয়ে যায়।

    সোজাসাপ্টা কথা হলো মানুষ তার সৃষ্ট যোগ্য ছাত্রের কাছেই আনন্দে পরাজয় স্বীকার করে। কেননা সূর্য যেমন না বলে সবাইকে প্রাণশক্তি দেয়, মেঘ যে বৃষ্টির জল দেয়, তেমনি বাতাসও বৈষম্য ও লোভ ছাড়াই ঠান্ডা করে সবাইকে বাঁচিয়ে রাখে, ফুলও তার সুগন্ধে সবার জন্য ছড়িয়ে দেয়। একইভাবে শিক্ষক তার জ্ঞান ছড়িয়ে দেয় শিষ্যর মধ্যে কোন ধরনে প্রতিদান ছাড়াই। তাঁর লক্ষ্য শিষ্য থেকে গুরুদক্ষিণা নেওয়া নয়, শিষ্যকে সূর্যের মতো উজ্জ্বল করা , যা গর্বের সঙ্গে গুরুর মাথা উঁচু করবে।

    একজন প্রাচীন গুরু তার আশ্রম নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলেন। গুরু বুড়ো হয়ে গিয়েছিলেন এবং তখন তিনি তাঁর বাকি জীবনটা হিমালয়ে কাটাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার জায়গায় কে একজন যোগ্য উত্তরসুরি হবেন , কে সঠিকভাবে আশ্রম চালাতে পারবে তা নিয়ে গুরু চিন্তিত ছিলেন । সেই আশ্রমে দুজন যোগ্য শিষ্য ছিলেন এবং দুজনেই ছিলেন গুরুর প্রিয়। গুরু তাদের দুজনকে ডেকে বললেন- শিষ্যগণ, আমি তীর্থযাত্রায় যাচ্ছি এবং গুরুদক্ষিণা হিসাবে আমি আপনাদের কাছে যা চাইছি তা হল এই দুই মুঠো গম। আপনারা প্রত্যেকেই এক মুঠো করে রাখুন এবং যখন আমি আসব, তখন আমাকে এই দুই মুঠো গম ফিরিয়ে দিতে হবে। যে শিষ্য তার গম নিরাপদে আমার কাছে ফিরিয়ে দেবে, আমি তাকে এই গুরুকুলের গুরু হিসেবে নিযুক্ত করব । উভয় শিষ্যই গুরুর আদেশ মেনে গুরুকে বিদায় দিলেন

    একজন শিষ্য গুরুকে “শ্বর” মনে করতেন। তিনি গুরুর দেওয়া এক মুঠো গম বেঁধে একটি প্যানে নিরাপদ করে রেখেছিলেন এবং প্রতিদিন এটির পূজা শুরু করেছিলেন। আরেকজন শিষ্য, যিনি গুরুকে জ্ঞানের ঈশ্বর মনে করতেন, তাই তিনি গুরুর দেওয়া সেই এক মুঠো গাম গুরুকুলের পিছনে মাঠে বপন করেছিলেন। কয়েক মাস পরে যখন গুরু এলেন, তিনি তার শিষ্যদের ডাকলেন এবং তার সেই গম ফেরত চাইলেন। যিনি গুরুকে “শ্বর” বলে বিশ্বাস করতেন। তিনি গুরুর দেয়া গম গুরুর কাছে নিয়ে গেলেন এবং বললেন যে তিনি প্রতিদিন সেই এক মুঠো গম পূজা করতেন। গুরু দেখলেন পাত্রের গম পচে গেছে এবং সেগুলো আর কোনো কাজে আসছে না।

     

    অতপর গুরু সেই শিষ্যকে জিজ্ঞাসা করলেন যিনি গুরুকে জ্ঞানের দেবতা বলে বিশ্বাস করতেন তাকে তার গম দেখানোর জন্য। তিনি গুরুকে আশ্রমের পিছনে নিয়ে গেলেন এবং বললেন – গুরুদেব, আপনি যে ফসলটি দেখছেন, এটি আপনার মুষ্টিমেয় সেই গম এবং আমি দু:খিত যে আপনি যে গমটি দিয়েছিলেন সেই একই গম আমি আপনাকে ফেরত দিতে পারছি না।সমৃদ্ধশালী ফসল দেখে গুরুর মন খুশি হয়েছিল এবং তিনি বলেছিলেন যে শিষ্য গুরুর জ্ঞান ছড়িয়ে দেয় , বিতরণ করে, সে উত্তম উত্তরাধিকারী হওয়ার যোগ্য। মূলত এটাই গুরুর প্রতি প্রকৃত দক্ষিণা।

    আমরা সকলেই জানি সাধারণ অর্থে গুরুদক্ষিণা হলো
    কোনো শিক্ষা বা জ্ঞান দেয়ার বিনিময়ে পুরস্কার হিসেবে অর্থ বা দ্রব্য নেওয়া। কিন্তু গুরুদক্ষিণার প্রকৃত অর্থ অনেক বিস্তৃত। উপরের উদাহরণের আলোকে বলা যায়, গুরুদক্ষিণা অর্থ হলো গুরুর কাছ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা ও জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া এবং জনকল্যাণের জন্য সঠিকভাবে ব্যবহার করা।

     

    লেখক

    মোঃ মোশারফ হোসাইন
    সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, নবীনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

  • ফেসবুকে