• শিরোনাম

    নবীনগরের এক কিশোরীর স্বপ্ন পূরণের গল্প

    নিউজ ডেস্ক।। | শুক্রবার, ১৩ জুলাই ২০১৮ | পড়া হয়েছে 9370 বার

    নবীনগরের এক কিশোরীর  স্বপ্ন পূরণের গল্প

    আসমা জাহান সরকার

    নবীনগরের কৃতি সন্তান আসমা জাহান সরকার

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আসমা জাহান সরকার ৩৬তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশ প্রাপ্ত হয়েছে।

    তাকে নিয়ে লিখেছেন এম এম মুজাহিদ উদ্দীন

    ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাক্ষণবাড়ীয়া জেলার নবীনগর উপজেলার আহাম্মদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আসমা জাহান সরকার।

    ডাক নাম আসমা। বাবা আবদুল হান্নান সরকার একজন কৃষক, মা খোশনাহার বেগম একজন গৃহিণী। ১১ ভাই-বোনের মধ্যে সবাই অত্যন্ত মেধাবী, তার অনান্য ভাই বোন ও দেশে বিদেশে ভালো অবস্থানে আছেন।

    আসমা ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত আহাম্মদ পুর গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় জেলায় প্রথম স্থান লাভ করে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়ে সফলতার সাথে প্রাথমিকের গন্ডি পেরোন।

    ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে চান্স পেয়ে যান কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী নবাব ফয়জুন্নেচ্ছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। অষ্টম শ্রেণির সরকারি বৃত্তি পরীক্ষায় কুমিল্লা জেলায় ৩য় স্থান লাভ করে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিলেন। ফলো ছাত্রীর তকমা তার গায়ে লেগে যায়।পরিবারের সদস্যরা স্বপ্ন দেখেন আসমা বড় হয়ে একজন ডাক্তার হবেন। সেই ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে-ই বিজ্ঞান বিভাগে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন।

     

    ২০০৮ সালে কুমিল্লা বোর্ড থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫.০০ পেয়ে মাধ্যমিকের চৌকাঠ পেরোন। বোর্ড বৃত্তিতে সম্মিলিত মেধাতালিকায় ১৯ তম হয়েছিলেন। মাধ্যমিকের গন্ডি পার হওয়ার পরে আসমার ভবিষ্যত পরিকল্পনা পরিবর্তন করেন। ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা বাদ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন অথবা সামাজিক বিজ্ঞানের যে কোন বিষয়ে পড়ে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। পরিবারের অনেক সদস্যের আপত্তি সত্ত্বেও বুয়েটে পড়ুয়া আপন দুই ভাইদের সমর্থনে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। মানবিক বিভাগে ভর্তি হওয়ার কারণে সামাজিক ভাবে নানান মানুষের নানান কটু কথাও শুনতে হয়েছে।

     

    মানুষের কটু কথা গুলো আসমা সেদিন নিজের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন। সেদিন থেকে মনের মধ্যে একটা জেদ তৈরি হয়েছিল। ভেবেছিলেন তিনি জীবনে এমন কিছু করবেন যাতে তাকে সমাজে অন্যরকম মর্যাদায় আসীন করেন। সেই থেকে স্বপ্নের যাত্রা শুরু। ২০১০ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫.০০ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। বোর্ডে সম্মিলিত মেধাতালিকায় অবস্থান ছিল ৩য় স্থান অধিকার করেন।

    এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে :২০১০-১ সেশনে খ-ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ৩৭৪ -তম হয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে-ই পারিবারিক উৎসাহ আর বাবা-মা আর নিজের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে বিসিএস এর জন্য মনোনিবেশ শুরু করেন।

     

    ১ম বর্ষ থেকেই সাধারণ গণিত আর ইংরেজির চর্চা করতেন নিয়মিত। তারপর ৩য় বর্ষ থেকে একাডেমিক পড়াশুনার পাশাপাশি রুটিন করে নিয়মিত বিসিএস-এর সিলেবাস ধরে ধরে পড়া শুরু করেন।প্রলি-লিখিত দুইটা সিলেবাস একসাথে মিলিয়ে পড়ার চেষ্টা করেছেন। আসমা বলেন, এতে আমার অনেক সুবিধা হয়েছে লিখিত পরীক্ষার অনেক পড়া-ই আমার আয়ত্ত্বে ছিল, যা লিখিত পরীক্ষায় আমাকে অনেক সাহায্য করেছিল। আমার বিভাগের একাডেমিক অনেক পড়াশোনা সরাসরি আমার বিসিএস-এ কাজে দিয়েছে, আমি বলব এটা ছিল আমার জন্য প্লাস পয়েন্ট। 

    আসমা একাডেমিক পড়াশুনার পাশাপাশি বিসিএস এর জন্য পড়লেও ডিপার্টমেন্ট -এর পড়াশোনা ও করেছেন রুটিন মেনে। সেটা তার ফলাফলেই প্রমাণ মেলে অনার্সে সিজিপিএ-৩.৫২ পেয়ে বিভাগে ৯ম স্থান লাভ করেন, মাস্টার্সে সিজিপিএ-৩.৭৫ পেয়ে ২য় স্থান অর্জন করেন। তারপর জীবনের প্রথম বিসিএস পরীক্ষা দিয়েই মেধায় প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপÍ হয়েছেন।

    আসমা প্রস্তুতির সময়ের কথা বলতে গিয়ে বলেন, বাংলাদেশ কুয়েত-মৈত্রী হলের শিকদার মনোয়ারা ভবনের নীচ তলার রিডিং রুম-ই ছিল বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সেরা পাওয়া, ঘুমের সময়টা ছাড়া বাকী সময়টা আমি কাটিয়েছি রিডিং রুমেই,সব সময় পড়তে ভাল লাগতো না তবুও রিডিং রুমেই বসে থাকতাম।

    কঠোর পরিশ্রম করার মানসিকতা আমি পেয়েছি আমার গুণবতী মায়ের কাছ থেকে,রিডিং রুমে যখন ডিপার্টমেন্ট এর পড়া আর বিসিএস এর পড়া একসাথে পড়তে হতো খুব হাঁপিয়ে যেতাম,ক্লান্ত লাগতো, রিডিং রুম থেকে বেড় হয়ে মাকে ফোন দিতাম,৪/৫ মিনিট কথা বলতাম মায়ের সাথে অসম্ভব প্রাণশক্তি ফিরে পেতাম,বারবার মায়ের একটা কথা-ই প্রতিধ্বনিত হতো-মা আমি দু’আ করি আল্লাহ তোমার জন্য সব সহজ করুক,আল্লাহ তোমার মনের আশা পূরণ করুক।

    এভাবেই মায়ের দু”আ নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা রিডিং রুমের চেয়ার-টেবিলে বসে পড়াশুনা করেছি আর আল্লাহ আমাকে দু’হাত পূর্ণ করে সফলতা দিয়েছেন।

    আসমা বলেন, বিজ্ঞান, বাণিজ্য, মানবিক কে কোন বিষয়ে পড়ছে সেটা জরুরী না, জরুরী হচ্ছে আমি যা নিয়ে পড়ছি আমাকে খেয়াল রাখা এই পর্যার্য়ের সর্বোচ্চ জায়গায় যেন আমি নিজেকে নিয়ে যেতে পারি। সব বিভাগে থেকেই জীবনে ভালো কিছু করা যায়।

     

    প্রথম বিসিএস-এ মেধায় প্রশাসন ক্যাডার প্রাপ্তির অনুভূতি কী? এমন প্রশ্নের জবাবে আসমা বলেন, আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে আর্থ -সামাজিক অবস্থা এমন যে একজন বিসিএস ক্যাডার তার তিনটি প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করে-যেমন:তার বাবার প্রজন্ম, তার নিজের প্রজন্ম, তার পরের প্রজন্ম। বিসিএস প্রশাসন আমার কাছে আসলেই একটি স্বপ্নের নাম ছিল, আর আমি আমার স্বপ্ন পূরণে কঠোর পরিশ্রম করেছি আর আজ আমার সেই স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আল-আমিন আমাকে নিজের আলোয় আলোকিত হওয়ার সুযোগ প্রদান করেছেন।

     

    এখন আমার আর একটি বড় স্বপ্ন আছে,আমি সচিব হতে চাই, আমার বাবা-মা,ভাই-বোনরা যেন আমাকে নিয়ে গর্ববোধ করে বলতে পারে আমাদের মেয়েটি আমাদের পরিবারকে,সমাজকে অনেক কিছু দিয়েছে। সফলতা পেতে কোন বিষয়গুলো নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে? জানতে চাইলে আসমা জানান, সুনিদিষ্ট লক্ষ্য, কঠোর পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাস এই তিনটি-ই আমাকে আজকের এই সফলতা এনে দিয়েছে।

    আসমার পাবলিক পলিসি আর সুশাসন এই দু’টি বিষয়ে উচ্চতর গবেষণা করার ইচ্ছে পোষণ করেন। একাডেমিক জ্ঞানটাকে নিজের পেশাগত জীবনে কাজে লাগিয়ে এই দেশের সাধারণ মানুষের উপকার করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

    আগামী দিনের বিসিএস স্বপ্ন প্রত্যাশীদের জন্য পরামর্শ দিয়ে আসমা বলেন, আমার আহবান রইল,আপনারা আগে নিজের লক্ষ্য ঠিক করুন, কঠোর পরিশ্রম করুন, নিজের উপর আতœবিশ্বাস রাখুন আপনার স্বপ্নও একদিন সত্যি হবে ইনশাআল্লাহ।

     

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আদর্শ ডাক্তার হতে চায় মীম

    ০৮ অক্টোবর ২০১৮ | 999 বার

    ঐতিহ্য দিয়া কি অইবো……!!

    ১৩ অক্টোবর ২০১৮ | 575 বার

    আর্কাইভ

  • ফেসবুকে nabinagar71.com